ডিজিটাল জীবনে আপনার চোখ ও তথ্য থাকুক নিরাপদ

যুগে যুগে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিষ্কার মানুষের জীবনকে করেছে সহজ, আনন্দময় ও নিরাপদ। কিন্তু বর্তমানের অধিকাংশ আধুনিক প্রযুক্তি অন্য যে কোন সময়ের চাইতে মানবজাতির জন্য অধিকতর হুমকি হয়ে উঠছে। বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ধর্মীয় অনুশাসন মানার ক্ষেত্রে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উদ্দেশ্য মানব কল্যাণ থেকে দূরে গিয়ে হয়ে উঠেছে মুনাফা সর্বোচ্চকরণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এজন্য আমাদের জানতে হবে অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার কৌশল কি কি?

এ সকল প্রযুক্তির অধিকাংশই উদ্ভাবিত হচ্ছে অমুসলিমদের হাতে। ফলে তারা ধার ধারছে না কোন নৈতিকতার বা ধর্মীয় অনুশাসনের। আর এ কারণেই আজ পৃথিবী ব্যাপী অশ্লীলতার সয়লাব। নেই কোন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। এ সকল প্রযুক্তি আপনার আমার প্রতিটি কীবোর্ডের প্রেস থেকে শুরু করে জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত ট্র্যাক করে। এমনকি যখন আপনি ঘুমিয়ে আছেন তখনও। প্রিতিদিন গুগল মেটা আপনাকে আমাকে ট্র্যাক করছে। তাদের আদর্শ কৌশলে পুশ করছে।

এই সময়ে আমাদের দৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে পারাটাই যুগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনার দৃষ্টিকে হারাম থেকে বাঁচাতে এবং আপনার ব্যক্তিগত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখতে তুর্কি ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ‘হালালজ ই-টিকারেট লিমিটেড কো’ ডেভেলপ করেছে অনেকগুলো অ্যাপ যেগুলো ডিজিটাল জীবনকে নিরাপদ ও গুনাহমুক্ত করতে সহায়ক ও কার্যকারী ভূমিকা রাখবে ইনশাআল্লাহ্‌।

চোখের যিনা / গুনাহ থেকে বাঁচার উপায় এবং দোয়া

একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের শুধু ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নয় বরং আমাদের চিরস্থায়ী জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আর আজকের এই সস্তা প্রযুক্তি সর্ব প্রথম আমাদের কে যেই পাপে লিপ্ত করছে তা হল – চোখের যিনা। এটি খুবই ভয়ানক পাপ। এই পাপ থেকে আরও বড় পাপের সূচনা হয়। কল্বের নূর চলে যায়। আমলের স্বাদ চলে যায়। আমল করে আগের মত তৃপ্তি পাওয়া যায় না। এই প্রতিষ্ঠান গুলো আপনি না চাইলেও আপনাকে হারাম কনটেন্ট দেখাবে। এ জন্য আপনাকে কয়েক ধরণের সচেতনাতা গ্রহণ করতে হবে।

প্রথমত, আপনি নিচে দেওয়া অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার কৌশল গুলো ফলো করবেন। তারপর, আল্লাহর রাসুল মুহাম্মাদ সঃ এর দেওয়া নির্দেশিত পথ অনুসরণ করবেন। এবং রাসুল সঃ এর শিখিয়ে দেওয়া দোয়া পড়বেন।

চোখের যিনা / গুনাহ থেকে বাঁচার দোয়া

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِي وَمِنْ شَرِّ بَصَرِي وَمِنْ شَرِّ لِسَانِي وَمِنْ شَرِّ قَلْبِي وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّي

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন শাররি সাময়ি, ওয়া মিন বাচারি ওয়া মিন শাররি লিসানি ওয়া মিন শাররি ক্বালবি ওয়া মিন শাররি মানিয়্যি।’

অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কানে মন্দ কথা শোনা থেকে আশ্রয় চাই। চোখ দিয়ে মন্দ কিছু দেখা থেকে আশ্রয় চাই। জিহ্বা দিয়ে মন্দ কিছু বলা থেকে আশ্রয় চাই। অন্তরের খারাপ চিন্তা থেকে আশ্রয় চাই। দেহের কামনা-বাসনার খারাপ চিন্তা থেকেও আশ্রয় চাই।’ (আবু দাউদ, তিরমিজি, নাসাঈ)

অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখার কৌশল কি কি?

অ্যাপ পরিচিতি

কাহাফ ব্রাউজার

এটি হল এআই সম্বলিত ও নিরাপদ একটি ব্রাউজার। যেটি আপনি আপনার ডিজিটাল ডিভাইসে ইন্সটল করে ডিফল্ট ব্রাউজার হিসেবে সেট করে ব্যবহার করতে পারেন। যেটি ক্রম, অপেরা মিনি এর পরিবর্তে ব্যবহার করলে অনেকগুলো অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন। এতে ২ টি এক্সটেনশন যুক্ত রয়েছে। একটি হল কাহাফ গার্ড, আরেকটি হল সেফ গেজ এআই। এ দুটি সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হবে। এছাড়াও আপনি ব্যাকগ্রাউন্ড ডাটা ট্রাকার অ্যাপ গুলো দেখতে পাবেন এবং সেগুলোকে ব্লক করে দিলে আপনার গোপনীয়তা কিছুটা বাড়বে। তুলনামূলক সুবিধাসমূহ দেখতে এবং ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন।

কাহাফ গার্ড

এটি আপনাকে নিরাপদ রাখবে ৫৯ লাখ ৬ হাজার এরও অধিক এডাল্ট সাইট থেকে। ব্লক করবে এন্টি ইসলামিক কনটেন্ট ও বিজ্ঞাপন। এটি একটি প্রাইভেট ডি এন এস প্রদান করবে যেটি আপনার ফোনে এর সেটিংস এ সেট করে দিলেই আপনি নিরাপদ থাকতে পারবেন। তবে, আপনার চেষ্টা ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। কাহাফ ব্রাউজার ব্যবহার করলে এটি আর ইনস্টল করার প্রয়োজন নেই। ডাউনলোড করুন কাহাফ গার্ড।

সেফ গেজ এআই

সেফ গেজ আই হলো অসাধারণ একটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সম্বলিত একটি এক্সটেনশন। আপনি আপনার কম্পিউটারে যে কোন ব্রাউজারে যুক্ত করে নিলে সে সকল হারাম পিকচার কে ব্লার বা অস্পষ্ট করে দেবে। আপনি চাইলে সেখানে আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী সেটিং করে নিতে পারবেন। আর আপনি যদি মোবাইল ব্যবহার করে থাকেন তাহলে কাহাফ ব্রাউজারে সেটি বাই ডিফল্ট সেট করা থাকবে। কোন সাইট পিউরিফাই না করতে চাইলে সেটি ও সেট করে দেওয়া যায়। ডাউনলোড করুন সেফ গেজ এআই।

কাহাফ টিউব

কাহাফ টিউব দিবে আপনাকে একটি হালাল ইউটিউব এক্সপেরিয়েন্স। এখানে রয়েছে অনেকগুলো বিশেষায়িত ফিচার যেমন – কিডস মুড, হারাম চ্যানেল থেকে অটো আনসাবস্ক্রিপশন, হারাম কনটেন্ট অপসারণ। এসবের পিছনে কাজ করছেন একদল মুফতি ও ইসলামিক স্কলারস। যাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আপনাকে ইসলামিক মূল্যবোধের সাথে একটি হালাল টিউব এক্সপেরিয়েন্স প্রদান। তাই দেরি না করে এখনই ব্যবহার শুরু করুন। এটি ও আপনি আপনার যে কোন ধরণের ডিজিটাল ডিভাইসে ব্যবহার করতে পারবেন। ডাউনলোড করুন কাহাফ টিউব।

কাহাফ মেসেঞ্জার

কাহাফ মেসেঞ্জার হল বিজ্ঞাপন বিহীন ও ট্রাকার ফ্রি শারিয়া কমপ্লায়েন্ট মেসেজিং সল্যুশন। এতে রয়েছে পার্সোনালাইজড স্টিকার, গ্রুপ কল, সিমলেস অডিও ও ভিডিও কল এবং হারাম ফাইল ফিল্টারেশন এবং গাইরে মাহরাম ভিডিও কল ব্লকিং এর মত দারুণ সব ফিচার। কাহাফ মেসেঞ্জার ডাউনলোড করুন।

হিকমাহ – সোশ্যাল মিডিয়া

এটি ফেসবুক এর মতই একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তবে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে কোন রিলস বা অশ্লীল কোন কন্টেন্ট আসবে না।

কাহাফ অ্যাডস

এটি হল গুগল অ্যাডসেন্স এর অল্টারনেটিভ একটা অ্যাড নেটওয়ার্ক যেটা অলরেডি খুব ভালো করছে। আমরা সকলে যদি মেটা এবং গুগল কে টাকা দিয়ে অ্যাড না দিয়ে এসব নেটওয়ার্ক ব্যবহার করি। এরাই একদিন নিরাপদ উপায়ে আমাদের জন্য উন্নত মানের অ্যাড সিস্টেম উপহার দিবে।

এই উদ্ভাবন গুলো আল্লাহর একটি বাণী স্মরণ করিয়ে দেয় –

তারা চক্রান্ত করে আর আল্লাহও কৌশল করেন। আল্লাহই হচ্ছেন সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী।

 (সূরা আনফালঃ ৩০)

ডিজিটাল ডিভাইস এর ভয়াবহতা ও আমাদের সমাজ এবং দেশের চিত্র

ডিজিটাল ডিভাইসের ভয়াবহতা সম্পর্কে যদি আপনার জানা থাকে তাহলে স্কিপ করে পরের প্যারা পড়তে পারেন। এটি মূল আলোচনার বিষয় নয়। এটি দেওয়ার কারণ হল – আপনি যদি এই ডিজিটাল ডিভাইস এর ভয়াবহতা উপলব্ধি না করেন, তাহলে এই প্রযুক্তি গুলো আবেগের তাড়নায় কয়েকদিন ব্যবহার করবেন তারপর খেই হারিয়ে আবার ফিরে যাবেন আগের অভ্যস্ত বিষয় গুলোতেই।

খুব সম্প্রতি খোদ মোবাইল ফোনের আবিষ্কারক মার্টিন কুপার আক্ষেপ করেছন –

লোকজন এ ভাবে সারা দিন ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকবে তা আগে ভাবিনি। তিনি জানান, তাঁর নিজের সৃষ্টির প্রতি লোকজনের এতটা মোহ তাকে আনন্দ দেয় না। বরং ভাবায়। কষ্ট দেয়।

সমকাল

ডিজিটাল ডিভাইসে আমাদের দেশের শতকরা ২৮ শতাংশ তরুণ- তরুণী দিনে ৬ ঘণ্টার বেশি ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করছে। সর্বমোট ৭৫ শতাংশের ও বেশি তরুণ তরুণী ২-৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইসে ব্যয় করে। এটি শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান। তবে বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ হবে বলে আমি মনে করি।

আচ্ছা, তারা কি ব্যবহার করছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা অনলাইন গেমস – পাবজি, ফ্রি ফায়ার বা কল অফ ডিউটি খেলছে। অথবা ব্যবহার করছে সোশ্যাল মিডিয়া – ফেসবুক, টিকটক, লাইকি, ইউটিউব। এর থেকে ও ভয়াবহ হচ্ছে কিশোর কিশোরীরা প* আসক্ত হয়ে পড়ছে। এত অল্প বয়সেই এ ধরণের বিষয়ের সাথে পরিচিত হওয়ার ফলে তার কৈশোর শুরু হচ্ছে অবৈধ প্রেম দিয়ে আর শেষ হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও আত্মহত্যা এর মধ্য দিয়ে। আর এর মাঝে অনৈতিক মেলা মেশার মত খারাপ কাজ তো এখন হয়ে উঠেছে সমাজের খুবই সাধারণ ঘটনা। এমনকি কিশোর কিশোরীদেরকে ও দেখা যাচ্ছে *ন পল্লিতে। আর এগুলোর প্রভাব পড়ে বৈবাহিক জীবনেও।এজন্যই আমাদের সমাজে ভয়াবহ হারে বাড়ছে ডিভোর্স রেট ও পর** এর মত জঘন্য সকল সামাজিক সমস্যা।

এছাড়াও অনলাইন জুয়া, সেলিব্রেটি হওয়ার নেশা এর মত অসংখ্য সামাজিক সমস্যা জন্ম দিচ্ছে এই ডিজিটাল ডিভাইস। আপনার চারপাশে দৃষ্টি ঘুরালে দেখতে পাবেন যে গ্রামে নিম্ন আয়ের পরিবারের কিশোর কিশোরীরা মডেল হওয়ার নেশায় দিন রাত টিক টকে ভিডিও বানাচ্ছে। জনপ্রিয়তার জন্য গায়ের পোশাক খুলতেও একটু ভাবছে না। এরকম অসংখ্য বিষয় রয়েছে যার প্রতিটি টপিক নিয়েই হাজার শব্দের লেখাতে ও শেষ হবে না। এখানে শুধু মেজর কয়েকটি বিষয় আপনাদের মনে করিয়ে দেওয়া।

একটি দেশ বা জাতির প্রাণ হল সম্ভাবনাময়ী তরুণ ও যুব সমাজ। তারা যদি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়, তাহলে দেশ ও সমাজের সামনের দিনগুলো কত ভয়াবহ হতে পারে! উপরে বর্ণিত সমস্যাগুলোর কুপ্রভাব পড়ছে ব্যক্তি জীবনে, পরিবারে, সমাজে এবং দেশের অর্থনীতিতে। এই তরুণ তরুণী দীর্ঘ সময় ডিজিটাল ডিভাইসে তাকিয়ে থাকার ফলে তারা আক্রান্ত হচ্ছে নিরব মহামারী ‘মায়োপিয়া’ নামক দৃষ্টি রোগে এবং ‘নোমোফোবিয়া’ নামক মানুষিক রোগে।

মোবাইল ফোনে যে যাই দেখুক হোক সেটা গেম, মুভি, নাটক, খবরের কাগজ অথবা শিক্ষামূলক কোন সেশন সবজায়গায়ই থাকছে অর্ধ নগ্ন নারী যেটি দেখে খুব স্বভাবতই একজন তরুণ যুবক আকৃষ্ট হচ্ছে এবং এর সমাপ্তি ঘটছে হস্ত*** এর মত জীবন বিনষ্টকারী বদ অভ্যাসের মধ্য দিয়ে। যার ফলে একজন তরুণ যুবকের টেস্টোস্টরেন কমে যায় ১০ গুণের ও বেশি।

এর প্রভাব পড়ে তার দৈনন্দিন অন্য সকল কাজে। সে আগ্রহ হারায়, অলসতায় নিমগ্ন থাকে, দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে, নিজেকে সর্বদা গুটিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। এরই মধ্যদিয়ে তৈরি হয় একটি ভঙ্গুর, দায়িত্বহীন, অলস ও কর্মস্প্রিহা বিহীন যুবসমাজ। যেটি আমাদের মত জনবহুল ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতির জন্য অতি দুঃখের। আমরা মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রচারণা চালালেও সেগুলোর জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এই ডিজিটাল ডিভাইসের আসক্তি বা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

তাই আসুন আমারা সকলে সময়ের গুরুত্ব দেই। নিজের চোখ ও তথ্য হেফাজত করি। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করি। ইসলামিক মূল্যবোধ এর আলোকে আমাদের জীবন পরিচালনা করি। ডিজিটাল জীবনকে আরও নিরাপদ ও গুনাহমুক্ত রাখার জন্য সচেষ্ট থাকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *